বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতিতে সোচ্চার জামায়াতে ইসলামীর চিত্র প্রদর্শনীতে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ও অন্যান্য নেতাদের ছবি স্থান পেলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি না রাখায় বিতর্কের ঝড় উঠেছে। কেবল স্বৈরাচারীদের ইতিহাস তুলে ধরার অজুহাত দেওয়া হলেও প্রদর্শনীতে বেগম খালেদা জিয়া ও ছাত্রনেতাদের আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। এই রাজনৈতিক বৈপরীত্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
রাজধানী ঢাকার মিন্টো রোডে জামায়াত আমিরের সরকারি বাসভবনে ‘জুলাই এখনো শেষ হয়নি’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পর্যন্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্ব এতে দেখানো হয়। সেখানে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণের ছবিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে তুলে ধরার পাশাপাশি পরবর্তী একদলীয় শাসনের জন্য তাকে স্বৈরশাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
প্রদর্শনীতে জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি বা স্বাধীনতার ঘোষণার উল্লেখ না থাকায় বিতর্ক ওঠে। জামায়াত আমির শফিকুর রহমান এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, জিয়াউর রহমান একনায়ক শাসক ছিলেন না বলেই তার ছবি প্রদর্শনীতে রাখা হয়নি। তিনি কেবল আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ও শেখ হাসিনার মতো কর্তৃত্ববাদী শাসকদের ইতিহাস তুলে ধরার কথা বলেন।
তবে জামায়াত আমিরের ব্যাখ্যার পরও নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। প্রদর্শনীতে কেবল স্বৈরাচারদের চিত্র ফুটিয়ে তোলার কথা বলা হলেও খালেদা জিয়ার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদের মতো সমন্বয়কদের ছবি রাখা হয়েছে। এতে শেখ মুজিবুর রহমানের ভালো-মন্দ দুই দিকই দেখানো হলেও জিয়াউর রহমানকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টিকে রহস্যজনক উল্লেখ করে বিএনপি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আলোচনা সভায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই প্রদর্শনীর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত নিজেদের প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধের চিত্র রাখলেও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের অবদান চেপে গেছে।
এদিকে এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ নামের একটি সংগঠনও। সংগঠনটির দাবি, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে জামায়াত আমীরের বাসভবনে মুজিবকে ‘মহিমান্বিত করা হচ্ছে’। পুনরায় রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক খোমেনী ইহসান জানান, জামায়াত আমীরের বাসভবনে আয়োজিত ওই প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একপেশেভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে জামায়াত একটি রাজনৈতিক অশুভ মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নব্বইয়ের দশকের মতো দলটি আবারও কোনো রাজনৈতিক সমঝোতায় যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আলোচনার মধ্যে জামায়াত আমীর মধ্য নভেম্বরে ঢাকা সরকারবিরোধী সমাবেশ ডেকেছেন। জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের মতে, এই কর্মসূচি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ হতে পারে। প্রদর্শনীতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ প্রদর্শন করে জামায়াত শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে খোমেনী ইহসান দাবি করেন, ওই প্রদর্শনীতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার তথ্য এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। কেবল ৭ মার্চের বক্তব্যকে বড় করে উপস্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের বাকশাল গঠন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ এবং তৎকালীন সরকারের নানা বিতর্কিত ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এই রাজনৈতিক ইতিহাসকে এড়িয়ে গিয়ে জামায়াত জনগণের সঙ্গে অসদাচরণ করছে।
জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের আহ্বায়ক বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংঘটিত নানা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং সবশেষে জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে পুনর্বাসিত করার যেকোনো চেষ্টা জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী।
