নিখোঁজ হওয়ার পরদিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী জঙ্গল থেকে মরদেহ খুঁজে পাওয়া স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলায় নিজবাসার কাছেই কোটবাড়ি উপশহরের গন্ধমতি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে সকাল ১০টা ১০ মিনিটের দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে প্রথম ও পরে বেলা ১১টায় তার বাসা সংলগ্ন গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা হয়। এসব জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশ নেন। সহপাঠী ও শিক্ষার্থীরা অপ্রতিমকে চোখের জলে বিদায় জানান। এ সময় এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
অপ্রতিম (১৩) কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে এবং স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার বিকেলে কোটবাড়ি এলাকার ভাড়াবাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় সে। এরপর আর বাসায় ফেরেনি। কোটবাড়ী-গন্ধমতি এলাকায় তাদের বাড়ি। অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পরে বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় জিডি করেন।
বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার বলেছিলেন, শুক্রবার জুমার নামাজের পর অপ্রতিম আমাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খায়। পরে বন্ধুদের সঙ্গে আইফোন দিয়ে ছবি তুলতে বাইরে যেতে চায়। কিন্তু আর ফিরে আসেনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, সম্ভবত আইফোনটিই তার মৃত্যুর কারণ হয়েছে। পরদিন শনিবার দুপুর ১টার দিকে সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
অপ্রতিম খুনের ঘটনায় সিসিটিভি সূত্র ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মোট তিনজনকে আটক করে পুলিশ। তারা হলেন– তুহিন, আনাস ও ফাহিম। তাদের সবার বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। শনিবার বিকেল ৩টার দিকে তুহিনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। পরে অভিযান চালিয়ে তুহিনের বাড়ি থেকে আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, কুমিল্লায় শিশু অপ্রতিম হত্যা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে তিনজন সরাসরি জড়িত। বাকি একজনের সম্পৃক্ততার বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। গ্রেপ্তারদের একজন কুমিল্লা সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার নূরে আলমের ছেলে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। বাকি তিনজন কিশোর।
পুলিশ সুপার জানান, অপ্রতিম নিখোঁজের জিডির (সাধারণ ডায়েরি) পরপরই আমরা তদন্ত শুরু করি। আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অপ্রতিমকে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যায় তুহিন। মূলত অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনের দিকে নজর ছিল তার।
তিনি আরও জানান, তুহিনকে গ্রেপ্তারের পর তার তথ্যে সালমানপুর এলাকার এক কিশোর এবং তার বন্ধু হাতিগাড়া এলাকার আরেক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই তিনজনই হত্যায় সরাসরি জড়িত। এ ছাড়া গ্রেপ্তার সদর দক্ষিণের এলাহিপুর এলাকার আরেক কিশোরের তথ্য যাচাই চলছে।
শনিবার দুপুরে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধার হয়। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ছেলের সন্ধানে হয়রান মা লিখেছিলেন– ‘ছেলেকে কই খুঁজব, জঙ্গলে নাকি পানিতে? ও কি বেঁচে আছে?’ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের এই পোস্ট শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ভাইরাল হয়। ফুটফুটে ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) সন্ধানে অনেকেই পোস্টটি শেয়ার দেন। কিন্তু তাকে জীবিত পাওয়া যায়নি। মায়ের ‘নাড়ি ছেঁড়া ধন’ অপ্রতিমকে পাওয়া গেছে জঙ্গলেই।
