বাংলাদেশের গৌরবের একটা বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭১ সাল। এদেশকে স্বাধীন করতে প্রতিটি সেক্টরের লোকজন যুদ্ধ করেছে। পিছিয়ে ছিলেন না খেলোয়াড়রাও। এ দেশের জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা শত বাধা উপেক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। বর্তমান স্পিকার ও জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার মেজর হাফিজ উদ্দিন বীর বিক্রম এবং মেজর জেনারেল খোন্দকার নূর উন নবী (অব.) সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। নূর উন নবী একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ময়দান থেকে এসে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের হয়ে প্রথম ও উদ্বোধনী ম্যাচটিতেও খেলেছেন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়তে এবং মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে অর্থ যোগান দিতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারতের সেরা সেরা ফুটবল দলের বিরুদ্ধে জানবাজি রেখে প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচে অংশ নিয়েছেন ফুটবলাররা। ১৯৭১ সালে ভারতীয় মুদ্রায় ৫ লাখ রুপি সংগ্রহ করে বাংলাদেশের সেই ফুটবলাররা মুক্তিযোদ্ধা ফান্ডে জমা দিয়েছিলেন। সেই অর্থে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র ও খাদ্য সংগ্রহ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ একাদশ নামে খেলা দলটি স্বাধীনতার পর ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ নামে পরিচিত হয়। এই দলের খেলোয়াড়রা পরে বাংলাদেশের গেজেটেড ফ্রিডম ফাইটার হিসেবে স্বীকৃতিও পান। সরকারী ভাতা ও সুযোগ সুবিধাও পান। তবে, ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলকে দল’টিকে বাংলাদেশ সরকার থেকে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় পদক বা স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।
এই দলের কিছু সদস্য অবশ্য ব্যক্তিগত কৃতিত্বের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা লাভ করেছেন। এই দলের অধিনায়ক ও ডিফেন্ডার বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক মো. জাকারিয়া পিন্টু এবং এই দলের ফরোয়ার্ড ও বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের দ্বিতীয় অধিনায়ক কাজী সালাউদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। দলটির সহ অধিনায়ক প্রতাপ শঙ্কর হাজরা হকিতে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। এই দলের মোহাম্মদ কায়কোবাদ, মেজর জেনারেল খোন্দকার নূর উন নবী, এনায়েতুর রহমান, নওশেরুজ্জামান জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন।
দল হিসেবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জাতীয় পর্যায়ে সম্পূর্ণ স্বীকৃতি ও স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদানের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানানো হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি এই দলটির খেলোয়াড়দের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাটাগরি থেকে অবনমন করিয়ে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাটাগরিতে স্থান দেয়া হয়েছে। দলটির স্বীকৃতির জন্য সরকারের দ্বারে দ্বারে এতদিন ঘুরেছেন অধিনায়ক মো. জাকারিয়া পিন্টু, সহ অধিনায়ক প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, মেজর জেনারেল খোন্দকার নূর উন নবী ও নওশেরুজ্জামান। এদের মধ্যে মো.জাকারিয়া পিন্টু, মেজর জেনারেল খোন্দকার নূর উন নবী ও নওশেরুজ্জামান মারা গেছেন। মো. কায়কোবাদ অসুস্থ্য, শয্যাশায়ী। বয়সের কারণে সহ অধিনায়ক প্রতাপ শঙ্কর হাজরাও এখন সব জায়গায় একাকি মুভ করতে পারেন না। কঠিন এ সময়ে অবহেলিত এই দলটির জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতির জন্য মাঠে নেমেছেন জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত ক্রীড়া সাংবাদিক কাজী ইমরুল কবীর সুমন। ‘মতিঝিল সেন্ট্রাল স্পোর্টস একাডেমি’র ব্যানারে তিনি চেষ্টা করছেন দলটির জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি আদায়ের। ইতিপূর্বে মতিঝিল প্রগতি সংঘের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন কাজী ইমরুল কবীর সুমন ২০১৬ সালে প্রগতি সংঘের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলটিকে দলীয়ভাবে সম্মানিত করেন। এর আগে কাজী সালাউদ্দিন সভাপতি থাকাকালীন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলটিকে বাফুফে ভবনে সংবর্ধনা দেয়। বর্তমানে কাজী ইমরুল কবীর সুমন অধিনায়ক মো. জাকারিয়া পিন্টু ও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের স্মৃতিবিজড়িত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার ১নং ইউনিয়ন বড়াইলে শিশু কিশোরদের একটি খেলার মাঠ তৈরীর চেষ্টা করছেন। ইতিমধ্যেই সেখানকার বড়াইল বাজারের উত্তরে হিন্দুবাড়ির পুকুরপাড়ে একটি সরকারী খাস জমি উদ্ধার করে সেটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ হিসেবে উন্মুক্ত করেছেন। সেই মাঠটি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক মো. জাকারিয়া পিন্টুর নামে নামকরণ ও সংস্কারের জন্য তিনি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের কাছে আবেদন করেছেন। সেই সঙ্গে রাজধানী ঢাকার মতিঝিল ক্লাবপাড়া বিশেষ করে বাফুফে ভবন, মতিঝিল থানা, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেড, ওয়ারী ক্লাব, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, সোনালী অতীত ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, দিলকুশা ক্লাব, ঢাকা মেরিনার ইয়াংস ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব এর সামনের রাস্তাটি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক মো. জাকারিয়া পিন্টুর নামে নামকরণের চেষ্টা করছেন। মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে অবস্থিত স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের রুমটিকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ঐতিহাসিক ছবি ও লেখা দিয়ে নতুন করে সজ্জিত করারও চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে কথা বলতে ও আবেদন জানাতে গত ২১ সেপ্টেম্বর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) এর পরিচালক (ক্রীড়া) মো. জাহেদ পারভেজ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করলে এ বিষয়ে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘জাকারিয়া পিন্টু ভাই দেশসেরা ফুটবলার বা বীর মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও একাধারে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক ছিলেন, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের টানা ৮ মওসুমের অধিনায়ক ছিলেন। পিন্টু ভাই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের ডিরেক্টর, স্পোর্টস (পরিচালক, ক্রীড়া) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। উনার জন্য কিছু করতে পারলে সবাই খুশী হবে। আর স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলটিকেও কেন আগে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হলো না সেটা এক বড় প্রশ্ন। আপনি এই দলটির সব কাগজপত্র ও ছবি আমাকে দিন। আমরা নিশ্চয়ই এবার দলটিকে রাস্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার চেষ্টা করবো।
