বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে কোচিং করতে ঢাকায় এসে বন্ধুর হাতে খুন হয়েছে টাঙ্গাইলের গোপালপুরের মেধাবী ছাত্র রাকিবুল হোসেন জয়। জয় (১৮) টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য ঢাকায় এসে ফার্মগেট এলাকা থেকে তিনি নিখোঁজ হন।
ঢাকায় নিজের কক্ষে এনে হত্যার পর কার্টনে ভরে বাসে করে নীলফামারীর ডিমলায় নিয়ে এসে লাশ মাটিচাপা দেয় তার কথিত বন্ধু আবদুল্লাহ আল মামুন। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে জয়কে জীবিত দেখিয়ে ভিডিও বানিয়ে পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ।
অবশেষে ক্লুলেস এ ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে অভিযুক্ত আবদুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে নীলফামারীর ডিমলা থেকে মাটি খুঁড়ে নিহত কিশোর জয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়।
নিহত রাকিব ইসলাম জয় টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের দাদীর আটা গ্রামের খাদেমুল ইসলামের ছেলে। অভিযুক্ত আবদুল্লাহ আল মামুন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ছাতনাই বালাপাড়া এলাকার আফসার আলীর ছেলে।
নিহতের পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঢাকার ধানমন্ডির শুক্রাবাদ এলাকায় রাকিবের সঙ্গে মামুনের পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
পুলিশের কাছে দেওয়া মামুনের ভাষ্যমতে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার একটি মেসে দুজনের মধ্যে বাগবিতণ্ডা ও সম্পর্কের অবনতি হলে একপর্যায়ে রাকিবকে শ্বাসরোধে হত্যা করে সে। হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে লাশ কার্টনে ভরে বাসা থেকে বের হয় মামুন। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে রংপুরগামী একটি বাসে ওঠার পর সহযাত্রী ও চালকের সহকারীরা কার্টনে কী আছে জানতে চাইলে সে ভেতরে ‘ইলিশ মাছ’ রয়েছে বলে জানায়।
পরে রংপুরে নেমে স্থানীয় বাসে করে ডিমলায় নিজ বাড়িতে পৌঁছায় এবং বসতঘরের পাশে কার্টনসহ জয়ের লাশটি মাটিচাপা দিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে যায়। এরপর নিখোঁজ জয়কে জীবিত দেখিয়ে এআই প্রযুক্তির সহায়তায় কৃত্রিম ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠায়।জয়ের নম্বর ব্যবহার করে তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপে জয়ের চোখ-মুখ বাঁধা ও নির্যাতনের ছবি পাঠায়। এ সময় ১৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে জয়কে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। ছেলেকে বাঁচানোর আশায় দরিদ্র কৃষক বাবা খাদেমুল ইসলাম ধারদেনা ও সুদে টাকা নিয়ে ১৩টি বিকাশ নম্বরে মোট পাঁচ লাখ টাকা পাঠান। টাকা পাওয়ার পর ওই নম্বরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। জয়কে না পেয়ে পরবর্তীতে পরিবারের পক্ষ থেকে ঢাকায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলে তদন্তে নামে পুলিশ। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত ৩ অক্টোবর ঢাকা থেকে মামুনকে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই সে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।
এ ঘটনায় ৫ অক্টোবর রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে নিহতের পরিবার। মামুনকে সঙ্গে নিয়ে ডিমলা থানা-পুলিশের সহায়তায় মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশে বালাপাড়ার একটি স্থান থেকে মাটি খুঁড়ে রাকিবের অর্ধগলিত লাশ উত্তোলন করা হয়। হত্যাকাণ্ডে রতন (২৬) ও নুর জামাল (২৫) নামে আরও দুজনের জড়িত থাকার তথ্য দিয়েছে মামুন; তাদের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
