March 26, 2026
WhatsApp Image 2026-03-25 at 2.40.42 PM

অনেক সময় ভুল থেকে যেমন শেখা হয়, তেমনি ভুল কাজ থেকেও সৃষ্টি হয় ভালো কিছু। তেমনই এক ভুল থেকে হাতিরঝিলে এসে পড়েছে চিলবিলগাছ। স্থপতি তুঘলক আজাদ বলছিলেন, ‘হাতিরঝিল থেকে বাড্ডা বেরিয়ে যাওয়ার পথে আমরা লাগাতে চেয়েছিলাম শালগাছ। কেননা, একসময় এখানে শালগাছই ছিল। শাল ঢাকার প্রাকৃত তরু হলেও এখন ঢাকা শহরে এ গাছ দেখাই যায় না। ঢাকা শহরে যে কয়েকটি আছে, তা ওই মিরপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। গাছ লাগানোর পরিকল্পনা অনুযায়ী হাতিরঝিলের জন্য ৬০টি শালগাছের চারা আনা হয়েছিল। সেসব চারার সঙ্গে সেখান থেকে একটি ভিন্ন গাছ চলে আসে। সেটাকে ফেলে না দিয়ে আমরা পথের ধারের সারিতে ২০১৮ সালে লাগিয়ে দিই। লাগানো শালগাছগুলোর অনেকগুলোই মরে গেছে, বর্তমানে ১০টি গাছ টিকে আছে। কিন্তু সেই চিলবিলগাছটি শালগাছগুলোকে ছাড়িয়ে বেশি বড় হয়ে গেছে। এখন দেখছি গাছে ফলও ধরেছে।’

সকালে পুরো হাতিরঝিলের গাছপালা দেখতে বেরিয়েছি কয়েকজন প্রকৃতিবন্ধু। চৈত্রেও বসন্ত বাতাস আর গাছপালার নতুন নতুন কচি পাতা, শান্ত ঝিলের জল, পাখিদের ডাকাডাকি, রৌদ্রমেঘের খেলা—সব মিলিয়ে যেন অসাধারণ এক সকালের আমন্ত্রণ পেলাম। কারওয়ান বাজার থেকে সোজা গিয়ে হাজির হলাম হাতিরঝিলের হাতির পালের কাছে। না, সত্যি হাতি না, ভাস্কর্য। হাতিরঝিলে গাছপালা লাগানোর পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত থাকা আজাদ ভাই কী কী গাছ দেখব, তার একটি তালিকা করে কাল রাতেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী আজ ৪৩টি গাছ দেখার কথা।

কারওয়ান বাজারের মোড়ে হাতিরঝিলে ঢোকার স্থান থেকেই শুরু হলো সে তরুযাত্রা। বসন্তে ফোটা পলাশ ফুল ঝরে গিয়ে সেসব গাছে এখন ঝুলছে থোকা থোকা কচি চ্যাপ্টা শিমের মতো সবুজ ফল, অশ্বত্থগাছের ন্যাড়া ডালপালা ভরে দিচ্ছে নবীন কচি লাজরাঙা পত্রপল্লব, আমচুন্দুল গাছে রয়ে গেছে মুকুলের রেশ, সে গাছে ডানাওয়ালা ফল ধরেছে থোকায় থোকায়। পুরো হাতিরঝিলের পাড় ধরে হেঁটে ঘুরে আসতে প্রায় ১৮ কিলোমিটার হাঁটতে হবে। হোক। তবু গাছগুলো যতটা সম্ভব দেখা চাই। হাঁটতে হাঁটতে একে একে দেখে ফেললাম তেলিগর্জন, ছাতিম, কনকচূড়া, পালাম, নাগলিঙ্গম, রক্তকাঞ্চন, জীবন, ফক্সটেইল পাম, খেজুর, সাইকাস, সেগুন, লম্বু, মেহগনি, টেবেইবুইয়া, জারুল, সোনালু, লাল সোনালু, মণিমালা, কদম, বট, স্বর্ণচাঁপা, গাব, পাকুড়, উদাল, কামিনী, কালোজাম, বউলা, শিমুল, বুদ্ধনারকেল, পবন ঝাউ ইত্যাদি গাছ।

সবশেষে আজাদ ভাই আমাদের শেষ চমক হিসেবে দুটি গাছ দেখানোর জন্য মনস্থির করে রেখেছিলেন। একটি হলো কালাহুজা, অন্যটি চিলবিল। কালাহুজাগাছটি ঢাকা শহরে আর চোখে পড়েনি, চট্টগ্রামের খুলশীতে গত বছর ফলসহ দেখেছিলাম। আজ হাতিরঝিলে বার্ড আইল্যান্ডের উল্টো দিকে পুলিশ ক্লাবের পাশের একটি মনোরম উদ্যানের এক কোণে দেখলাম ফুলে ফুলন্ত একটি কালাহুজাগাছ। চিলবিলগাছ কখনো দেখিনি।

গাছটার বয়স মাত্র সাত বছর হলেও দেখে মনে হচ্ছে বয়স বোধ হয় আরও বেশি। একই সময়ে লাগানো শালগাছের চেয়ে বেশ বড়, অনেক ডালপালা, নতুন পাতা আসছে। ডালে ডালে ঝুলছে অদ্ভুত চেহারার ফল। শুকনো প্রায় গোলাকার পাতলা কাগজের মতো ফিনফিনে পর্দার মধ্যে মাঝখানে রয়েছে বীজদানা। হালকা বাদামি রংটাকে আইভরি রঙের মতো মনে হচ্ছে, বীজের জায়গাটা কালচে বাদামি ও শক্ত। কিন্তু বীজের চারপাশে থাকা পাতলা পর্দা যেন পাপড়ভাজা, মুচ মুচ করে ভেঙে যাবে। ওই ডানার ওপর ভর করেই বাতাসে সসারের মতো ভাসতে ভাসতে বীজগুলো চলে যায় দূরে, বহু দূরে। মাটি তাকে ঠাঁই দিলে সেখানেই চারা গজায়। মাটি ভেজা থাকলে বা ভেজা মাটিতে বুনলে বীজ গজাতে প্রায় ১০ দিন লাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *