বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম কেবল একটি সশস্ত্র লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর ভেতরে একটি সুপরিকল্পিত ও বৈধ আইনি প্রক্রিয়া। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালোরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ যখন বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর জেনোসাইড বা গণনিধন শুরু করে, তখন স্বাধীনতার প্রশ্নটি আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে বিশ্বদরবারে আইনি ন্যায্যতা দিতে ১০ এপ্রিল জারি করা হয়েছিল ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’। এই ঘোষণাপত্রই মূলত স্বাধীন বাংলাদেশের আইনি ‘জন্মসনদ’।আন্তর্জাতিক আইনের ভাষায় বাংলাদেশের এই পদক্ষেপকে বলা হয় ‘ইউনিল্যাটেরাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স’ বা স্বাধীনতার একপক্ষীয় ঘোষণা। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে এই দলিলটি তৈরি করেছিলেন যাতে প্রমাণ করা যায় যে, বাংলাদেশের এই সংগ্রাম কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, বরং একটি বৈধ মুক্তিযুদ্ধ।
এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার নীতি চিরস্থায়ী হতে পারে না যদি একটি জনগোষ্ঠীর ‘আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ চরমভাবে লঙঘিত হয়। দীর্ঘ দুই দশকের শোষণ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গণরায় মেনে না নেওয়ার প্রেক্ষাপটে বাঙালিদের এই অধিকার প্রয়োগ ছিল আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ সঠিক সিদ্ধান্ত।ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক ধরনের বৈষম্য বিরাজ করছিল। রোডেশিয়ার (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) ক্ষেত্রে জাতিসংঘ যেমন কঠোর অবস্থান নিয়েছিল, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তারা অনেকটা নীরব ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতাকে সরাসরি রুখে না দিয়ে বরং পরোক্ষভাবে তাদের সাহায্য করেছিল কয়েকটি বৃহৎ শক্তির নীরবতা। তবে ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস (আইসিজে) ১৯৭২ সালের এক প্রতিবেদনে স্বীকার করে যে, বাঙালিদের নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করার পূর্ণ অধিকার ছিল।মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র ১৬ দিনের মাথায় এই ঘোষণাপত্র প্রবাসী মুজিবনগর সরকারকে বৈধতা দেয়। এতে স্পষ্ট করা হয় যে, ২৬ মার্চ থেকেই বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং এই রাষ্ট্রের একটি কার্যকর সরকার রয়েছে। জেনোসাইডের শিকার হওয়া একটি জনগোষ্ঠী যখন নিজস্ব ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই করে, আন্তর্জাতিক আইনে তাকে একটি বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতির সুযোগ তৈরি হয়।মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র ১৬ দিনের মাথায় এই ঘোষণাপত্র প্রবাসী মুজিবনগর সরকারকে বৈধতা দেয়। এতে স্পষ্ট করা হয় যে, ২৬ মার্চ থেকেই বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং এই রাষ্ট্রের একটি কার্যকর সরকার রয়েছে। জেনোসাইডের শিকার হওয়া একটি জনগোষ্ঠী যখন নিজস্ব ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই করে, আন্তর্জাতিক আইনে তাকে একটি বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতির সুযোগ তৈরি হয়।
