বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ক্রমবর্ধমান জুনোটিক বা প্রাণিবাহিত রোগ মোকাবিলায় ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘অভিন্ন স্বাস্থ্য’ পদ্ধতির ওপর জোর দিয়েছেন। এ বছরের প্রতিপাদ্য—‘বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একাত্মতা’—মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যের গভীর যোগসূত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে।
আইইডিসিআর (IEDCR)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাণী থেকে মানুষের দেহে রোগ ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দীর্ঘ এক দশক পর বার্ড ফ্লুতে এক শিশুর মৃত্যু বিশেষজ্ঞদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। তথ্য বলছে, গত দুই বছরেই দেশে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর অর্ধেক সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। শুধু বার্ড ফ্লু নয়, নিপাহ ভাইরাস, অ্যানথ্রাক্স এবং মশাবাহিত ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বিস্তারও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এই সংক্রমণের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনছে। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো আগস্টের তীব্র গরমেও নিপাহ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা আগে কেবল শীতকালীন সংকট হিসেবে পরিচিত ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বন উজাড়ের ফলে বাদুড় ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসছে। এছাড়া জীবন্ত পাখির বাজারগুলো এখন ‘বায়োলজিক্যাল রিঅ্যাক্টর’ হিসেবে কাজ করছে, যেখানে ভাইরাসগুলো নিজেদের পরিবর্তন করে মানুষের দেহে প্রবেশের সক্ষমতা অর্জন করছে। এ বছরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হলো অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, পোলট্রি ও গবাদিপশু খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে সাধারণ রোগ নিরাময় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। মুরগির মাংসের নমুনায় নির্ধারিত সীমার চেয়ে দশ গুণ বেশি অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য এক নীরব মহামারির মুখে দাঁড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি একটি চমৎকার পরিকল্পনা হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন এখনো যথাযথ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলকে কার্যকর পদক্ষেপে রূপান্তর করতে হবে। জীবন্ত পাখির বাজার নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানো পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগই পারে আগামীর স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আমাদের রক্ষা করতে।
