February 13, 2026
Capture

এজেন্সি: ২০১৭ সালে আমি বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক যুগান্তরে অনলাইন বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করি। তখন ডিজিটাল সাংবাদিকতা বাংলাদেশের জন্য ছিল এক নবজাগরণের সময়। সেই বছর সেপ্টেম্বর মাসে চীন সরকারের আমন্ত্রণে চীনের ইউনান ইউনিভার্সিটিতে সফরে যাই। সেই ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগে গিয়ে দেখি চীনা শিক্ষার্থীরা চমৎকার বাংলায় কথা বলছেন। খাঁটি বাংলা উচ্চারণে রবীন্দ্রনাথ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, এমনকি সমকালীন রাজনীতি নিয়ে তারা কথা বলছেন। আমাদের সম্মানে তারা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতসহ কয়েকটি জনপ্রিয় গান গেয়ে শোনালেন। সেখানেই চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল (সিআরআই)-এর বাংলা বিভাগের কিছু সংবাদকর্মীর সঙ্গে দেখা হয়। তারা কীভাবে বাংলাদেশের জন্য প্রতিদিন সংবাদ তৈরি করেন, কীভাবে শিক্ষার্থীদের বাংলা শেখান এবং বাংলা ভাষা নিয়ে তাদের আবেগ, ভালোবাসা ও আগ্রহ দেখে আমি অভিভূত হয়েছিলাম। তাদের কাজে যে নিষ্ঠা, সেই সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহারের যে দক্ষতা, তা তখনই বুঝিয়ে দিয়েছিল, চীনের সাংবাদিকতা প্রযুক্তিনির্ভর এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে।

এরপর ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে চীনের বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের আমন্ত্রণে সাংহাইতে অনুষ্ঠিত এক গ্লোবাল প্রেস কনফারেন্সে তথ্যপ্রযুক্তির ‘ফ্রন্টিয়ার’ সরাসরি দেখার সুযোগ পাই। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে আমার দেখা হয়। এরপর হুয়াওয়ের সেনজেন ও গুয়াংজুতে অবস্থিত ফ্যাক্টরি, অফিস ও রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার পরিদর্শনের সুযোগ পাই। সেখানেই আমি প্রথম উপলব্ধি করি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফাইভজি এবং স্মার্ট প্রযুক্তি কিভাবে চীনের সংবাদ ও যোগাযোগ খাতকে আমূল পরিবর্তন করছে। হুয়াওয়ের ল্যাবগুলোতে প্রবেশ করতেই দেখলাম ফাইভজি টেস্টবেড, রোবোটিক অ্যাসেম্বলি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর মতো অত্যাধুনিক উদ্ভাবন। এডভান্সড সাইবার সিকিউরিটি প্রযুক্তি, নতুন ধরনের হাইপারফাস্ট নেটওয়ার্ক, মেশিন ভিশন এবং স্পিচ-টু-টেক্সট পাইপলাইন সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের নিউজরুমের একটি সম্পূর্ণ ব্লুপ্রিন্ট যেন আমার চোখের সামনে উন্মোচিত হলো। সেই অভিজ্ঞতা আমাকে জানান দিয়েছিল, চীন কেবল প্রযুক্তি উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়, তথ্যপ্রবাহ ও সাংবাদিকতার জগতেও তারা বিশ্বনেতা হয়ে উঠছে। নিশ্চিত ছিলাম, গণমাধ্যমের পরবর্তী অধ্যায় হবে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি-চালিত, ডাটা-নির্ভর এবং ব্যবহারকারী-কেন্দ্রিক। আজ ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে, সেই ভবিষ্যদ্বাণী আর কেবল একটি ধারণা নয়; এটি একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা। এই বাস্তবতার প্রমাণ কী? চলুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক।

চীনের এআই বিপ্লব: ৬১.১% এআই পেটেন্ট চীনের

স্ট্যানফোর্ড এআই সূচক প্রতিবেদন ২০২৪ অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণায় চীন বর্তমানে বিশ্বে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের মোট এআই পেটেন্টের ৬১.১ শতাংশ চীনের নামে নিবন্ধিত, যা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির মানচিত্রে চীনের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি চীনের এআই গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এবং দ্রুত অগ্রগতির এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। এই বিশাল অংশীদারিত্ব চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক এআই ইকোসিস্টেমে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বাস্তব প্রয়োগ এই তিন অঙ্গনে চীন এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে শক্ত প্রতিযোগিতায় ফেলেছে। চীনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও টেক জায়ান্টগুলো যেমন ডিপসিক, বাইদু’স আর্নি বট, টেনসেন্ট হুন-ইউয়ান এবং আই-ফ্লাই-টেক স্পার্ক এখন বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতায় অগ্রগামী। বিশেষত ডিপসিক, যা মানুষের মতো প্রাকৃতিক ভাষায় কথা বলতে পারে, জটিল ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে, এমনকি সাংবাদিকতার রিপোর্টও তৈরি করতে সক্ষম। 

চীনে এআই ও সাংবাদিকতা: বদলে যাচ্ছে গল্প বলার ধরণ

চীনে এআই কেবল তথ্য বিশ্লেষণ বা নিউজ লেখা নয়, বরং সাংবাদিকতার পুরো ইকোসিস্টেমকে রূপান্তরিত করছে। আগে যেখানে সংবাদ তৈরি, যাচাই, সম্পাদনা এবং প্রকাশ ছিল সম্পূর্ণ মানবনির্ভর, সেখানে এখন এআই সাংবাদিকতার পুরো ইকোসিস্টেমকে পুনর্গঠন করছে-ডেটা সংগ্রহ থেকে গল্প বলার ধরন পর্যন্ত সবকিছুতে ঘটছে বিপ্লব। ডেটা জার্নালিজমের বিস্তারে এআই গভীরভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। বিপুল পরিমাণ বিগ ডেটা বিশ্লেষণ করে সংবাদযোগ্য তথ্য খুঁজে বের করা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক সহজ। চীনের প্রযুক্তিনির্ভর সংবাদমাধ্যমগুলো এআই-নির্ভর ভিজ্যুয়ালাইজেশন ব্যবহার করে জটিল অর্থনীতি, নির্বাচন বা সামাজিক পরিসংখ্যানের গল্পগুলোকে ডেটা-চিত্র, চার্ট, হিটম্যাপ এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ গ্রাফিক্সের মাধ্যমে উপস্থাপন করছে। ফলে সংবাদের গভীরতা যেমন বাড়ছে, পাঠকের বোধগম্যতাও তত দ্রুত উন্নত হচ্ছে।

এআই সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্সে বিপ্লব এনেছে। চীনের শীর্ষ মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এআই-ভিত্তিক সেন্টিমেন্ট অ্যানালাইসিস মডেল ব্যবহার করে পাঠকের প্রতিক্রিয়া, আবেগ এবং সামাজিক ট্রেন্ড গণনা করছে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো রাজনৈতিক ঘটনা বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের অনুভূতি ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক এআই তা রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ করছে। এতে সাংবাদিক ও সম্পাদকরা এখন কেবল সংবাদই তৈরি করছেন না, বরং ডেটা-ড্রিভেন কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিও তৈরি করছেন। এছাড়া এআই সাংবাদিকের কাজের ধরনই বদলে দিয়েছে। আগের সাংবাদিকরা শুধু তথ্য সংগ্রহ ও লেখায় সীমাবদ্ধ ছিলেন, আর এখন তিনি হয়ে উঠছেন ডেটা ডিজাইনার, তিনি তথ্যকে ভিজ্যুয়াল ডেটায় রূপ দেন। সাংবাদিকরা এখন ডিজিটাল স্টোরিটেলার, যিনি কাহিনীকে মাল্টিমিডিয়া আকারে নির্মাণ করেন। একইসঙ্গে এই যুগের সাংবাদিকরা একজন অ্যালগোরিদমিক থিংকার, যিনি অটোমেশন ও এআই-জেনারেটেড ডেটার ব্যাখ্যা করেন। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *