April 4, 2026
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সাফল্য: খাদ্যনিরাপত্তায় সম্ভাবনার দুয়ার খুলল ‘জিএইউ ধান ৪’

বাংলাদেশের কৃষি গবেষণায় যোগ হলো নতুন এক সাফল্যের পালক। দীর্ঘ এক দশকের নিরলস প্রচেষ্টার পর গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) একদল গবেষক উদ্ভাবন করেছেন আউশ ধানের নতুন জাত ‘জিএইউ ধান ৪’। স্বল্পমেয়াদি, উচ্চফলনশীল এবং চিকন দানা বিশিষ্ট এই জাতটি সম্প্রতি জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন লাভ করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্ভাবন দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করতে এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।

আজ শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এম ময়নুল হক ও মো. মসিউল ইসলামের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই নতুন জাতটি উদ্ভাবন করেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত ধানের জাতের সংখ্যা ৪টিতে এবং মোট ফসলের জাতের সংখ্যা ৯৫টিতে উন্নীত হলো।

সাধারণত আমন ও বোরো ধানের তুলনায় আউশ ধানের ফলন কম হলেও ‘জিএইউ ধান ৪’ সেই চিরচেনা চিত্র বদলে দিতে প্রস্তুত। গবেষকদের মতে, এটি অত্যন্ত স্বল্প জীবনকালের একটি জাত। বীজ বপনের মাত্র ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যেই ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। এর ফলে কৃষকেরা দ্রুত জমি খালি করে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত এলাকায় এই জাতটি কৃষির নিবিড়তা বৃদ্ধিতে এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

জাতটির বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি জনপ্রিয় জাত ‘পারিজা’ এবং উচ্চফলনশীল ‘বিইউ ধান-২’-এর সংকরায়ণের ফসল। গবেষণাগারে দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় জাতটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। ‘জিএইউ ধান ৪’ কেবল ফলনেই নয়, পুষ্টিগুণেও অনন্য। এতে প্রায় ২৪.৫৮ শতাংশ অ্যামাইলেজ এবং ৮.৩৮ শতাংশ প্রোটিন রয়েছে, যা মানবদেহের পুষ্টিচাহিদা পূরণে সহায়ক এবং সহজে হজমযোগ্য।

ফলনের দিক থেকেও এটি চমকপ্রদ। অনুকূল পরিবেশে হেক্টর প্রতি ৫ থেকে ৫.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া সম্ভব, যা সাধারণ আউশ জাতের তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া প্রতি হেক্টরে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ কেজি বীজের প্রয়োজন হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য বেশ ব্যয়সাশ্রয়ী। জলবায়ুসহনশীল এই জাতটি চাষে পানির প্রয়োজনও তুলনামূলক কম এবং এটি বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধী।

গবেষক দলের সদস্য অধ্যাপক মো. মসিউল ইসলাম বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল এমন একটি আউশ ধান উদ্ভাবন করা, যা অল্প সময়ে অধিক ফলন দেবে এবং বাজারে ভোক্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। ‘জিএইউ ধান ৪’ সেই লক্ষ্য পূরণে শতভাগ সফল।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান এই সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “এই উদ্ভাবন আমাদের গবেষকদের নিষ্ঠা ও মেধার এক অনন্য প্রতিফলন। এটি দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”

কৃষকদের জন্য পরামর্শ দিয়ে গবেষকেরা জানান, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এই ধানের বীজতলায় বপন করা উচিত এবং ২০-২২ দিনের চারা জমিতে রোপণ করতে হবে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির এই মেলবন্ধনে ‘জিএইউ ধান ৪’ বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ে এক নতুন অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *