February 13, 2026
Capture
এজেন্সি: দেশের বাজারে সয়াবিন তেল নিয়ে তুঘলকি কারবার বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। এক দিন আগে সোমবার ব্যবসায়ীরা এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেন। সংগঠনটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে দেশের বাজারেও সমন্বয় করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। কিন্তু এক দিন পর মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি। ব্যবসায়ী সমিতির দাম বাড়ানোর বিজ্ঞপ্তি দেয়ার এখতিয়ারও নেই। এমনকি, কেউ বাড়তি দামে তেল বিক্রি করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। 

রান্নায় সয়াবিন তেল লাগে। একেবারেই রোজকার দ্রব্য এ সয়াবিন তেল। কিন্তু সেটি কিনতে গিয়েই এবার একেবারে নাকানিচুবানি খেতে হচ্ছে দেশের মানুষকে। গত আগস্ট মাস থেকে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আপত্তিতে তা কার্যকর করা যায়নি। সোমবার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৬ টাকা বাড়িয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় ভোজ্যতেল রিফাইনারি সমিতি। মঙ্গলবার থেকে ভোজ্যতেলের নতুন দর কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে নতুন দামের বোতলজাত তেল দেখা যায়নি। বিক্রেতারা বলছেন, নতুন তেল এখনো দোকানে আসেনি। রাজধানীর একজন খুচরা বিক্রেতা বলেন, মাত্র ঘোষণা দিয়েছে, এখনো বাজারে আসেনি। এলে নতুন রেটেই বিক্রি করতে হবে। আমি এখনো আগের দামেই বিক্রি করছি।

এদিকে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন জানান, ভোজ্যতেলের দর সমন্বয়ে ব্যবহৃত ১৪ বছর আগের ফর্মুলাটি বিশ্লেষণ করছে আইসিএমএবি ও আইসিএবি। তাদের প্রতিবেদন আসার আগে দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। ব্যবসায়ী সমিতির প্রেস রিলিজ দেয়ার কোনো বৈধতা নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত না এটা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্বীকৃত হয়। তেল কোম্পানির মালিকানাধীন কিছু মিডিয়া এ ধরনের অস্থিরতা বাজারে তৈরি করছে।

এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, বরাবরের মতো দাম সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় কমিটি, বাণিজ্য সচিবসহ সরকারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সুনির্দিষ্ট মূল্যকাঠামো বিশ্লেষণ করেই সর্বসম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের। টিকে গ্রæপের পরিচালক শফিউল তসলিম বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে, সচিব এতে সভাপতিত্ব করেছেন। এখানে ট্যারিফ কমিশন ছিল, ভোক্তা ছিল, প্রতিযোগিতা কমিশন ছিল, আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের সব সদস্যরাও ছিলেন। সেখানে আমরা একটা দাম প্রস্তাব করেছিলাম, সেটা আবার তারা কমিয়েছেন। মিটিং হয়েছে, সবাই সাইন করেছেন, এখন আবার অন্য রকম শুনছি।

বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম মোল্লার সই করা প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সোমবার জানানো হয়, নতুন নির্ধারিত দামে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৫ টাকা এবং পাঁচ লিটার বোতল সয়াবিন তেল ৯৪৫ টাকা। খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ১৭৭ টাকা এবং খোলা পাম তেল ১৬৩ টাকায় বিক্রি হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ নতুন মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে, যা অনতিবিলম্বে কার্যকর হবে।

বর্তমানে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৮৯ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৭৪ টাকা এবং পাম তেল ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। সে হিসেবে লিটারপ্রতি ৩ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত মূল্য বাড়ানোর হলো।

গত মাসের শেষ দিকে ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ নিয়ে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। প্রতি লিটার ভোজ্যতেলের দাম ১০ টাকা বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল ভোজ্যতেল পরিশোধন ও বিপণনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে দাম লিটারে ১ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে এমন সিদ্ধান্তে মনঃপূত হয়নি বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন নেতাদের। পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ঘোষণা ছাড়াই বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে দেখা যায়। অভিযোগ আছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর যখন দাম বাড়ানোর বিষয়টি তদের মনঃপূত হয়নি, তখন তারা বাজারে সয়াবিন ও পামতেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন সাধারণত এ ধরনের পণ্যের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারমূল্য পর্যালোচনা করে। পর্যালোচনা শেষে ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন সংগঠনের ব্যানারে বিষয়টি প্রেস রিলিজ আকারে গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেয়। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটা আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশি। এটা আমরা পর্যালোচনা করছি, তারপর তাদের সঙ্গে সভা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অপরদিকে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সয়াবিন তেলের দাম ১,২০০ ডলার পর্যন্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে ১৮-২০ শতাংশের মতো। দাম বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে পাম অয়েলেরও। যে কারণে এই দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অপরদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) গত ১৫ সেপ্টেম্বর সয়াবিন, সানফ্লাওয়ার, পাম ও ভুট্টার তেল আমদানিতে ১ শতাংশ উৎসে কর বসিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। যা ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে বলেও জানান ব্যবসায়ীরা।

এদিকে বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ইতোমধ্যেই বাজারে খোলা সয়াবিন ও সুপার পাম অয়েলের দাম বেড়েছে। গত তিন-চার দিনের ব্যবধানে এ দুই ধরনের তেলের দাম বেড়েছে লিটারে কম-বেশি পাঁচ টাকা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কাওরান বাজার কিচেন মার্কেটের পাইকারি ব্যবসায়ী মোখলেস উদ্দিন বলেন, কয়েক দিন ধরেই লক্ষ্য করছি, অর্ডার দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে আমরা আমাদের চাহিদামাফিক তেল পাচ্ছি না। কোম্পানিগুলো সুকৌশলে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে এক ধরনের সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।

তবে এমন অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা। তিনি বলেছেন, অভিযোগটি সত্য নয়। আন্তর্জাতিক বাজারেই দাম বেড়েছে। ফলে লোকসানের আশঙ্কা থাকলে সরবরাহে প্রভাব পড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমরা আমাদের কোম্পানির সরবরাহ সিস্টেমে কোনো পরিবর্তন আনিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *