October 24, 2026
WhatsApp Image 2026-10-24 at 9.23.49 AM (1)

বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলের মেঘের রাজ্য খ্যাত ‘সাজেক’ এর নিয়ন্ত্রণে দুই পাহাড়ি সংগঠনের লড়াইয়ের কারণে পর্যটন ব্যবসা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। একটি সংগঠনের অবরোধ থেকে পূজোয় পর্যটকদের জন্য রেহাই দেয়া হলেও পূজা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফের অবরোধের মুখে পড়েছে পাহাড়। এমনকি আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে সশস্ত্র পাহাড়িদের সঙ্গে একরকম যুদ্ধ করে মুক্ত করে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। এতে নিরাপত্তা বাহিনীর ৯ জন আহত হয়েছে বলে আইএসপিআর থেকেই জানানো হয়।

মেঘের রাজ্য সাজেকে রাঙামাটি ও বান্দরবান এ দুই পার্বত্য জেলা দিয়েই প্রবেশ করা যায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত নয়নাভিরাম এই স্থানটিতে উচ্চতার কারণে হাত দিয়েই মেঘ স্পর্শ করা যায়। ফলে পর্যটকদের কাছে স্থানটি খুবই আকর্ষণের। তাই স্থানটিকে ঘিরে কটেজ রেস্তোরাঁসহ নানা আকর্ষণীয় পাহাড়ি খাবার ও নানা পসরার বাণিজ্য জমজমাট। একারণেই অর্থনৈতিক লাভের সুযোগ নিতে পাহাড়ি সংগঠনগুলো সাজেক নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া।

সাজেক ২০০৮ সালের দিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে মানুষের নজরে আসে। পরে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আধুনিক রাস্তা-ঘাট ও সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে জনপ্রিয় পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে ওঠে।
বর্তমানে সাজেকে ছোট-বড় মিলে শতাধিক কটেজ রয়েছে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এ তিন মাস মূলত সাজেকের পর্যটন মৌসুম।

এ সময়ে কটেজ মালিকরা প্রায় ৩০ কোটি টাকার ব্যবসা করে থাকেন এবং পর্যটকরা রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়ার জন্য প্রতি দিন খরচ করেন প্রায় ২২-২৫ লাখ টাকা। এছাড়া পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যায়ের হরেক রকমের পণ্যের দোকান। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বছরে কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য করে। চান্দের (জিপ গাড়ি) গাড়িতে যাতায়াত, ঘোরাঘুরিতে পর্যটকরা ব্যয় করেন আরও প্রায় ৩০ কোটি টাকা। সাজেক পর্যটন ব্যবসা ছাড়াও কৃষি পণ্য আদা, হলুদ এবং ফুলঝাড়ু ও বাঁশের জন্য বিখ্যাত। প্রতি বছর এখানে উৎপাদিত এসব মসলা, ফুলঝাড়ু ও বাঁশের ব্যবসাও হয় কয়েক কোটি টাকার।

সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং দক্ষিণে মিজোরাম রাজ্য। সাজেক শুরু থেকে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দখলে ছিল। তবে 
সাজেকের ভূয়াছড়ি নামক এলাকায় স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অবস্থান ছিল বেশ পোক্ত। কয়েক বছর আগে সেনাবাহিনী ওই এলাকায় অভিযান চালালে স্বশস্ত্র সংগঠনটি সরে যায়। এরপর পুরো এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চলে সশস্ত্র সংগঠন মূল ইউপিডিএফ। হোটেল-মোটেল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত এমনকি পর্যটকদের জন্য সরবরাহ করা পানি থেকেও চাঁদা আদায় করে ইউপিডিএফ। কয়েক মাস আগে সাজেকের ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের সশস্ত্র কমান্ডার তরুণ চাকমা ৫০ জনের একটি দল নিয়ে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র দলে যোগ দিলে পিসিজেএসএসের ক্যাডাররা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদার ভাগ বসাতে সাজেকে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে। এসব অভিযানে প্রায় ৭০ ভাগ এরিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন তারা। স্থানীয় সংবাদকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, বাঘাইছড়ি উপজেলায় এম এন লারমা গ্রুপের পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস সংস্কার) সংস্কার গ্রুপ এক সময় দাপট দেখালেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সংগঠনটি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইউপিডিএফ তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন সাজেকের উজোবাজার এলাকায় তাদের কর্মী, সমর্থকদের (নারী-পুরুষ) নিয়ে পিসিজেএসএসকে সাজেক থেকে বিতারিত করতে অবরোধের মতো কর্মসূচির ডাক দেয়। এতে তাদের ছায়া সংগঠন সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন মাঠে নামে। ১১ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ পালন করে সংগঠনগুলো। পূজোয় অবরোধ তুলে নিলেও এখন আরও বড় পরিসরে অবরোধ শুরু হয়েছে। এতে পাহাড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অচল হয়ে পড়েছে পর্যটনবাণিজ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *