April 17, 2026
image (52)

দেশের লবণের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত কক্সবাজারে চলতি মৌসুমে লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং অকাল বৃষ্টির কারণে গভীর সংকটে পড়েছেন প্রায় ৪২ হাজার লবণচাষি। একদিকে উৎপাদন খরচের তুলনায় বিক্রয়মূল্য অনেক কম, অন্যদিকে কালবৈশাখী ও বৃষ্টির পূর্বাভাসে চাষিরা মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই মাঠ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে চলতি বছরে লবণের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ থেকে শুরু করে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া—সর্বত্রই এখন হাহাকার। মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতি মণ লবণ উৎপাদন করতে চাষিদের খরচ হচ্ছে প্রায় ২৯০ টাকা। অথচ বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। লোকসান দিয়ে লবণ বিক্রি করতে গিয়ে প্রান্তিক চাষিরা এখন ঋণের জালে জর্জরিত। চাষি আব্দুল জলিলের মতো অনেকেরই আক্ষেপ, লবণের দাম না বাড়লে দাদনের টাকা পরিশোধ করা তো দূরের কথা, পরিবারের ভরণপোষণ চালানোই অসম্ভব হয়ে পড়বে।

প্রকৃতিও এবার চাষিদের সহায় হয়নি। মৌসুমের শুরুতে ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহের কারণে উৎপাদন শুরু করতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন দেরি হয়েছিল। আবার মৌসুমের শেষ দিকে এসে ৭ ও ৮ এপ্রিলের ভারী বৃষ্টিতে শতভাগ লবণমাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে শত শত চাষির উৎপাদিত লবণ মাঠেই গলে নষ্ট হয়ে গেছে। সামনে আরও কালবৈশাখীর আশঙ্কা থাকায় নতুন করে মাঠ সংস্কার করে উৎপাদনে ফেরার সাহস পাচ্ছেন না চাষিরা। ফলে অনেক জায়গায় সাদা লবণের স্তূপের বদলে এখন খা খা করছে শূন্য মাঠ।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-এর তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণ চাষ হলেও উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অনেক কম। গত বছর ৬ এপ্রিল পর্যন্ত যেখানে ১৮ লাখ টনের বেশি লবণ উৎপাদিত হয়েছিল, এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ১৩ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টনে। অর্থাৎ গত মৌসুমের তুলনায় উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে ২৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন লবণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পূরণ হওয়া প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিসিকের মাঠ পরিদর্শকদের মতে, লবণের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং ঘন ঘন আবহাওয়ার পরিবর্তনই এই সংকটের প্রধান কারণ। উপকূলীয় অঞ্চলের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা রক্ষায় লবণের দাম অন্তত প্রতি মণ ৪০০ টাকা হওয়া উচিত বলে মনে করছেন কৃষকরা। সরকারি তদারকি ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ কুটির শিল্পটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *