পাহাড়ি অঞ্চলের সংগ্রামী মানুষ সন্ধ্যামণি চাকমা (৬৫)। রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়নের খামারপাড়ার এই বাসিন্দা একসময় নিজের আড়াই একর জমিতে প্রথাগতভাবে ধান চাষ করতেন। কিন্তু পানির সংকট আর উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে লাভের মুখ দেখা ছিল অনেকটা সোনার হরিণ। যে জমি থেকে মাত্র ৩০ হাজার টাকার ধান পাওয়া যেত, তার পেছনেই খরচ হয়ে যেত ১৮ হাজার টাকা। নিজের হাড়ভাঙা খাটুনির কোনো মূল্যই যেন অবশিষ্ট থাকত না। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে তাঁর জীবনের চিত্রটা আমূল বদলে যায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শে ধান চাষ ছেড়ে তিনি শুরু করেন আখ চাষ। বর্তমানে তাঁর আড়াই একর জমি সবুজে ঘেরা আখের খেতে পূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত পাম্প ও আখের রস মাড়াই করার যন্ত্র তাঁর এই যাত্রাকে আরও সহজ করে তুলেছে। মজার ব্যাপার হলো, সন্ধ্যামণি তাঁর উৎপাদিত আখ বাজারে বিক্রি করেন না। বরং রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কের পাশে ছোট্ট একটি দোকানে সেই আখের টাটকা রস বিক্রি করেন।
দৈনিক আয়: গড়ে প্রায় ২,০০০ টাকা।
বার্ষিক আয়কাল: বছরে টানা ৯ মাস তিনি রস বিক্রি করেন।
মোট উৎপাদন মূল্য: একই জমি থেকে বর্তমানে বছরে প্রায় ৬ লাখ টাকার ফসল পাওয়া যাচ্ছে।
নিট মুনাফা: সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তাঁর নিট আয় প্রায় ৪ লাখ টাকা।
রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী পর্যটক ও সাধারণ যাত্রীরাই তাঁর প্রধান ক্রেতা। অনেকেই তৃষ্ণা মেটাতে গ্লাসে করে রস পান করেন, আবার কেউ কেউ বোতল ভরে সঙ্গে নিয়ে যান। সন্ধ্যামণির এই অভাবনীয় সাফল্যে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে কৃষি কর্মকর্তারাও মুগ্ধ। সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহনাজ পারভীনের মতে, পাহাড়ের মাটি আখ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী এবং সন্ধ্যামণি এখন এলাকার অনেক কৃষকের জন্য রোল মডেল।
সন্ধ্যামণি চাকমা এখন মনে করেন, তামাক চাষের মতো ক্ষতিকর পেশা ছেড়ে পাহাড়ের কৃষকরা যদি আখ চাষে এগিয়ে আসেন, তবে তারা অনেক বেশি লাভবান হবেন। ধানের জমিতে আখের মিষ্টি রস যে এভাবে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবে, তা আজ পাহাড়ের অন্য কৃষকদের কাছে এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর এই নিরব বিপ্লব প্রমাণ করে যে, সঠিক দিকনির্দেশনা আর অদম্য ইচ্ছা থাকলে পাহাড়ের ঢালেও ভাগ্যের চাকা ঘোরানো সম্ভব।
